প্রাচীন দার্শনিকদের এই কৌশলের মাধ্যমে নিজের জীবনকে উন্নত করুন।

প্রাচীন দার্শনিকদের এই কৌশলের মাধ্যমে নিজের জীবনকে উন্নত করুন।

আমরা সবাই-ই নিজের জীবনটাকে আরেকটু ভালো, আরেকটু উন্নত করতে চাই। কিভাবে সুন্দরভাবে জীবনের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়, জীবনের পুরোটুকু নির্যাস কিভাবে বের করে আনা যায় – তা জানতে ও শিখতে চাই।

মার্কাস অরেলিয়াস, এপিকটেটাস এবং সেনেকার মতন দার্শনিকগণের থেকে প্রাপ্ত একটি কৌশল বা ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের কিভাবে জীবনে সাহায্য করতে পারে – আজকে সেটা জানার চেষ্টা করবো।

 

এই ফ্রেমওয়ার্কটির ব্যাপারে আধুনিক ধনকুবের ও বিলিওনেয়ার চার্লি মাঙ্গারও কথা বলেছেন। এবং তিনি জানিয়েছেন যে এটা তিনি নিজের জীবনেও ব্যবহার করেছেন এবং করেন।

মূলত চার্লি মাঙ্গার সম্পর্কে জানার ও পড়ার সময়ই তাঁর এই ব্যাপারটির সাথে আমি পরিচিত হই।

ফ্রেমওয়ার্কটির নাম ‘Inversion Thinking’। চলুন ব্যাপারটি আজকে আমরা ভালোভাবে জানার ও বোঝার চেষ্টা করি।

 

ইনভার্সন থিঙ্কিং কি?

ইনভার্সন থিঙ্কিং হলো ‘আপনি যা চান, তা ঠিক উল্টো দিক থেকে চিন্তা করা’। অন্যভাবে যদি বোঝাতে হয় তবে বলা যায়, আপনি যা চান বা কামনা করেন – সেটা চিন্তা না করে বরং যা একেবারেই চান না ও কামনা করেন না – সেটার ব্যাপারে ভাবা ও চিন্তা করা। 

ব্যাপারটা হয়তো বেশ জটিল লাগছে। সামনে আরো ব্যাখ্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করছি। 

মনে করুন কাল আপনার একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে, যাতে আপনি ভালো করতে চান। এখন এই ইন্টারভিউতে কিভাবে ভালো করা যায় সেটা চিন্তা করবেন নাহ। চিন্তা করবেন এই ইন্টারভিউতে আপনার কি কি ভুল হতে পারে – যেমন হয়তো আপনার পোশাক-আশাক সঠিক নাও থাকতে পারে, হয়তো আপনার ইন্টারভিউতে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে, হয়তো ইন্টারভিউতে ঢোকার সময় আপনার ফার্স্ট ইম্প্রেশনটা ভালো নাও হতে পারে। 

এই সম্ভাব্য ভুলগুলো যেন না হয় এবং এড়িয়ে চলা যায় – এটাই ইনভার্সন থিঙ্কিং। অর্থাৎ ভুল থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। একেবারেই যা ভুল, তা থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া।

স্কুল-কলেজের শিক্ষায় আমাদেরকে এমন জাতীয় চিন্তার কৌশল বা ফ্রেমওয়ার্ক শেখানো হয় নাহ। এটা আমাদেরকে নিজেদের শিখে নিতে হয়। 

 

জার্মান গণিতজ্ঞ কার্ল গুসতাভ জ্যাকব বলেছেন, “man muss immer umkehren”। যার কাছাকাছি ইংরেজি করলে দাঁড়ায়, “invert, always invert.”। 

অর্থাৎ, ঠিক বিপরীতটা ভাবো, বিপরীত দিকে চিন্তা করো।

মাঙ্গার বলেন, “জীবনের অনেক কঠিন সমস্যার ভালো সমাধান আপনার পাবার সম্ভবনা থাকে, যখন আপনি ঠিক এর বিপরীত দিক থেকে চিন্তা করতে করতে আগাবেন।”

 

মাঙ্গার আরো বলেছেন , “Invert, always invert: Turn a situation or problem upside down. Look at it backwards. What happens if all our plans go wrong? Where don’t we want to go, and how do you get there? Instead of looking for success, make a list of how to fail instead. Tell me where I’m going to die, that is, so I don’t go there.”

 

অর্থাৎ, “ঠিক বিপরীতটা ভাবো, বিপরীত দিকে চিন্তা করো। একটা ব্যাপার বা সমস্যাকে উল্টে ফেলো। পিছন থেকে একে দেখো। কি হবে যদি আমাদের সকল পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়? আমরা কোথায় যেতে চাই না এবং সেখানে কিভাবে যাওয়া যায়? সফলতার জন্য নয়, বরং কিভাবে ব্যর্থ হতে হয় তার একটা লিস্ট করো। আমাকে এটা বলো যে কোথায় গেলে আমি মারা যাবো, যেন আমি সেখানে না যাই।”

শেষ বাক্যটির মাধ্যমে চার্লি মাঙ্গার একটু মজা করেছেন। 

 

মার্কাস অরেলিয়াস, এপিকটেটাস এবং সেনেকার মতন দার্শনিকগণও ইনভার্সন থিঙ্কিং এর একটি রূপের চর্চা চালিয়েছেন সেই আদিকালে। স্টোয়িক এই দার্শনিকগণ এমনটা চিন্তা করতেন যে জীবনের বিভিন্ন খারাপ ঘটনা যদি তাঁদের সাথে ঘটে, তখন তাঁরা কিভাবে এর সম্মুখীন হবেন বা কি করবেন। হতে পারে যে তাঁদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলো বা তাঁরা দারুনভাবে অসুস্থ হয়ে গেলেন বা সমাজে তাঁরা সম্মান ও মর্যাদা হারালেন – তখন তাঁদের করণীয় কি হবে। 

স্টোয়িকগণ বিশ্বাস করতেন যে, আগে থেকে যদি তাঁরা সবচেয়ে বাজে ব্যাপার ও দুর্ঘটনাগুলো কল্পনা করে, এর বিপরীতে কি করা যায় বা কর্মপদ্ধতি ঠিক করে রাখেন; তাহলে এই দুর্ঘটনাগুলো যখন বা যদি আসলেই ঘটে, তবে তা অনেক ভালোভাবে সামাল দেয়া যাবে বা এড়ানো যাবে। স্টোয়িকগণ চিন্তা করতেন ব্যর্থতাকে তাঁরা কিভাবে সামাল দেবেন।

এটাই ‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’।

 

কঠিন সমস্যাগুলোর সমাধানের চিন্তা সবসময় একদিক দিয়ে করলে হয় নাহ। এদের কার্যকরি সমাধান বের করতে আপনাকে সামনে থেকে যেমন চিন্তা করতে হবে, তেমনি ঠিক পিছন থেকেও ভাবতে হবে। ‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’ অনেক সময় লুক্কায়িত সমাধান বের করতেও আপনাকে সাহায্য করবে, যা হয়তো সাধারণভাবে আপনার মনে আসতো নাহ।

‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’ একটি শক্তিশালী কৌশল এবং অন্যতম কার্যকর মেন্টাল মডেল। মেন্টাল মডেলের ব্যাপারে সামনে অন্য লেখায় আলোচনা করবো।

বাস্তব একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করা যাক। আপনি চাচ্ছেন আপনার অফিসের প্রোডাক্টিভিটি বাড়িয়ে তুলতে। এখন সামনে থেকে চিন্তা করলে প্রোডাক্টিভিটি কিভাবে কিভাবে বাড়িয়ে তোলা যায়, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা যায়। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ এই পদ্ধতিতেই আগাবে।

কিন্তু ‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’ এর মাধ্যমে আমরা এটা বিপরীত বা পিছন দিক থেকে চিন্তা করে বের করবো। কি কি জিনিস এমন আছে যা অফিসে প্রোডাক্টিভিটিকে নষ্ট করে বা কমিয়ে দেয়? এমন জিনিসগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে এগুলো কমানোর বা দূর করার চেষ্টা করবো। তাহলে আমাদের যে প্রধান লক্ষ্য “প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো”, তা অনেকদূর আগাবে।

এরূপ মাথায় চিন্তা আসলো যে “ভালো জীবন কিভাবে পাবো”। তখন এর উল্টোটা নিয়ে ভাবি, “কিভাবে খারাপ জীবন পাবো”। এবং সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। 

‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’ এভাবেই কাজ করে। 

এ সংক্রান্ত আরেকটি লেখা আছে এই ব্লগে। পড়ে দেখতে পারেন। বোকামিগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে সেখানেও। Avoiding stupidity is easier than seeking brilliance.

ওয়ারেন বাফেট এবং চার্লি মাঙ্গার তাঁদের বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় বলেছেন যে, তাঁরা সবসময় বোকামিগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে গেছেন এবং এইভাবেই আস্তে আস্তে বিনিয়োগে তাঁরা সফলতা পেয়েছেন।

 

তাহলে প্রাকটিকাল জীবনে একে কিভাবে ব্যবহার করবেন? 

আমরা যা চাই না, সেটা নিয়ে আমরা বেশিরভাগ সময়েই ভাবি না, ভাবতে চাইও নাহ – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসের অনেক খ্যাত-বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এভাবে ‘ইনভার্সন থিঙ্কিং’ চিন্তা করতেন। কারণ বাজে আউটকাম তাঁরা এড়াতে চাইতেন। ভুল ও বোকামি থেকে বেঁচে থাকার জন্য এই ফ্রেমওয়ার্কটি তাঁদের সাহায্য করতো।

ইনভার্সন থিঙ্কিং আপনাকে সবসময় হয়তো সমস্যার সমাধান এনে দেবে না। কিন্তু এটা আপনাকে বিপদ বা ভুল থেকে বেঁচে থাকতে অনেক ক্ষেত্রেই সাহায্য করবে। স্টুপিডিটি থেকে বেঁচে থাকতে এটি অনেকটা ফিল্টারের মত কাজ করবে। 

Inversion Thinking আপনাকে সমস্যাটি বুঝতে আরো ভালোভাবে সাহায্য করে, বিভিন্নভাবে চিন্তা করে, নানা দিক থেকে সমস্যাটিকে দেখে এর কার্যকরি সমাধানে আসতে সাহায্য করে।

ইনভার্সন থিঙ্কিং এর এই ফ্রেমওয়ার্কটি থেকে আপনি যদি কিছু শিখতেই চান তাহলে এই জিনিসটিই শিখুন – “ব্রিলিয়ান্ট হবার চেষ্টা করার থেকে সাধারণ বোকামিগুলো থেকে বেঁচে থাকার দিকে মনোযোগ বেশি দিন।”

 

এই লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টে লিখতে পারেন। এবং আমার ওয়েবসাইটের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ে দেখতে পারেন। 

Leave a Reply