চরিত্রের ভদ্রতার গুণটি আপনাকে কিভাবে অনন্য মর্যাদায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

চরিত্রের ভদ্রতার গুণটি আপনাকে কিভাবে অনন্য মর্যাদায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

সেদিন একটা বই পড়ছিলাম। লেখাগুলো খুব একটা বড় বড় নয়। বইটিতে লেখক জীবনের নানা নিয়ম কানুন নিয়ে বেশি কথা বলেছেন। বইটির নাম The Art of Worldly Wisdom। মূল লেখক Baltasar Gracian, ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Christopher Maurer।

বইটিতে আছে কিছু ছোট ছোট বাস্তববাদী নিয়ম কানুন আর কিছু হলো চিন্তা চেতনায় ধারণ করার মত বিষয় যা আপনাকে সাহায্য করতে পারে নতুন করে কিছু শিখতে।

এগুলোর বেশিরভাগই বলতে গেলে খুব সাধারণ কথাই, যা আমরা আমাদের বাবা-মা তথা গুরুজন ও পারিপার্শ্বিকতার থেকে জেনে ও শিখে থাকি।

এগুলোর মধ্যে একটা কথা নিয়ে আজকে আলোচনা করতে চাই। 

লেখকের ভাষ্যমতে, “Be known for your courtesy”। অর্থাৎ মানুষ আপনাকে আপনার ভদ্রতার জন্য জানুক ও চিনুক।

আমাদের সমাজে একটা অপ্রচলিত নিয়ম আছে। আমরা অনেকেই নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতে বা “আমি কত হনুরে” ভাবটা জমাতে কখনো কখনো একটু রূঢ় আচরণ করে থাকি। আর কারো কারো ক্ষেত্রে যেন এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু যখন আপনার পরিচয়ে ভদ্রতাবোধ প্রকাশ পাবে তখন আপনার পরিচিত মহলে আপনার একটা সূক্ষ্ম পরিচয়বোধ তৈরি হবে। আপনার কাছের মানুষেরা আপনার এই ব্যাপারটা সম্পর্কে জানবে এবং কদর করবে।

 

তবে ভদ্রতা মানে এখানে উইকনেস বা দুর্বলতা বোঝানো হয় নি। হতে পারে কেউ আপনাকে কোন কাজ করতে বলল, যা আপনার পক্ষে করা সম্ভব না বা আপনি কোন কারণে কাজটি করতে চান নাহ। আপনার পক্ষে যে কাজটি করা সম্ভব না, তা আপনি সুন্দরভাবে ও ভদ্রভাবে তাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। এতে তিনি একটু মন খারাপ করলেও, আপনার প্রতি রাগ পুষে রাখবেন না – কারণ আপনি সুন্দরভাবে তাকে বুঝিয়ে বলেছেন।

আপনার ভদ্রতার এই গুণটিই প্রশংসার দাবীদার। যখন এটি কারো মাঝে থাকে এবং সে এটির কদর করে এবং মেনে চলে, তার শত্রুর সংখ্যা একেবারেই কম হয়। কারণ তীক্ষ্ণ কথার আঘাতে সে সাধারণত মানুষকে জর্জরিত করে না। 

ভদ্রতার বিপরীত দিকটাই ভেবে দেখা যাক না কেন!? যখন আপনি মানুষের সাথে অভদ্র আচরণ করবেন, (কোন প্রয়োজন নেই তবুও) বাজেভাবে কথা বলবেন, বাজে আচরণ করবেন, খোঁটা দিবেন, মানুষকে ছোট করবেন – তখন অন্যান্য মানুষ এগুলোতে কষ্ট পাবে এবং আপনার আচরণ তারা ভালোভাবেই মনে রাখবে। হয়তোবা তারা মুখে তখনই কিছু সরাসরি বলবে নাহ, কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে তাদের মন। 

এভাবে দেখবেন নিতান্ত ভালো মানুষগুলোকে আপনি আস্তে আস্তে আপনার বাজে ব্যবহার দিয়ে পর করে দিয়েছেন। আপনার এই বাজে ব্যবহার ও অভদ্রতার দরুন আপনি অনেকগুলো সুযোগ মিস করবেন বা হেলায় হারাবেন। 

রূঢ় বা বাজে ব্যবহার যদি অহঙ্কার থেকে আসে, তা যেমন খারাপ; আবার যদি বংশ পরম্পরায় আসে, তাও খারাপ। 

বলা হয়ে থাকে যে “ব্যবহারই বংশের পরিচয়”। যা অনেকাংশেই সত্যি। 

ভালো ব্যবহার কম করবেন না বেশি? বেশির দিকে থাকাটাই ভালো। আমার জীবনে আমি যখনই Thank You আর Please শুনেছি, আমার মনে আছে আমি একটু হলেও ভালোভাবে সেই মানুষটির প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলাম, কিছুটা খুশি হয়ে, কিছুটা অবাক হয়ে।

Thank You, Please, Excuse Me হয়তো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা অন্যরকম হিসেবে গণ্য হয়, কখনো কখনো দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু সঠিক সামাজিক অবস্থানে এবং কালচারে (যেখানে আপনি আমি বেশি বেশি থাকতে ও যেতে চাই) এই কথাগুলোর ভালো মূল্যায়ন আছে।

 

বইটিতে এও বলা আছে যে আপনার (আপাতত দৃষ্টিতে) শত্রুপক্ষকে ভদ্রতা ও আদব দেখান, আপনি ভালো ফলাফলই পাবেন। এতে অন্তত তারা আপনার কার্যকলাপকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেবে না(বেশিরভাগ ক্ষেত্রে)। অর্থাৎ ভদ্রতা বা ভালো ব্যবহার ঠিক এতটাই মূল্যবান। 

আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মাঝে আমরা অনেক ক্ষেত্রে একে অপরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসি এবং এতে অপর মানুষটি মনে কষ্ট পায়। সত্যিকারের ভদ্রতাবোধ বজায়ে রাখা হলে এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এড়িয়ে চলা সম্ভব।

কাউকে যদি কোন কঠিন কথা বলতেই হয়, কারো প্রয়োজনীয় সমালোচনা করতেই হয় – সেটাও সুন্দরভাবে আপনি তার সম্মান বজায়ে রেখে করতে পারেন। তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমান করার দরকার নাই। 

ভালো আচরণ করতে, আদব দেখাতে আমাদের কোন খরচ হয় নাহ – কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা অপরকে যেমন সম্মানিত করতে পারি, তেমনি নিজেরাও সম্মানিত হই। অর্থ কাউকে দিলে, তা আমাদের হাত থেকে চলে যায় কিন্তু সম্মান কাউকে দিলে, তা আমাদের থেকে চলে যায় না।

তবে এখানে কিছু কথার অবকাশ থেকে যায়। কেউ কেউ আপনার প্রতি আসলেই একটা বাজে মনোভাব পোষণ করতে পারে, আপনার ক্ষতি করতেও চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার কৌশল কি হবে? সেক্ষেত্রে আমরা গেম থিওরি থেকে আমাদের কি করণীয় তা শিখতে পারি। গেম থিওরি নিয়ে আলোচনা আরেকটি লেখায় করবো। 

এই লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টে লিখতে পারেন। এবং আমার ওয়েবসাইটের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ে দেখতে পারেন। 

Leave a Reply